কুড়িগ্রাম খবর

`গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র’ কে এই ইমরান এইচ সরকার?

`গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র’ কে এই ইমরান এইচ সরকার?

নিজস্ব সংবাদদাতাঃ 

সুপ্রিম কোর্ট ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চাওয়ায় শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের একাংশের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারের নাম আবার আলোচনায় উঠে এসেছে। কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার অজপাড়াগাঁ বালিয়ামারীর বাজারপাড়া গ্রামের ইমরানের হঠাৎ বিখ্যাত (!) হয়ে উঠার গল্প সবার জানা। কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় শাহবাগে ব্লগারদের মাসব্যাপী অবস্থান কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে আবির্ভাব ঘটে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারকদের হঠাৎ নেতা ইমরানের। জাতীয় পরিসরে উল্কার বেগে এ আবির্ভাব তার সৃষ্টিকারীদেরই ঈর্ষার কারণ হয়ে উঠেন। শাহবাগী ইমরানের অর্থবৃত্ত, দিনে তিনবার পাঞ্জবি পরিবর্তন, এলাহী জীবন-যাপনসহ পরবর্তী ঘটনা সবার জানা। প্রশ্ন হলো কে এই ইমরান এইচ সরকার? কী তার পরিচয়? ১৬ কোটি মানুষের দেশে হঠাৎ করে তার নেতৃত্বে চলে আসার নেপথ্যের রহস্য কী? মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নেতৃত্ব দেয়ার একমাত্র যোগ্য তিনিই?  পেশাগত কারণে কুড়িগ্রামের রাজিবপুর যাওয়া হয়েছে একাধিকবার। ব্রহ্মপুত্র-তিস্তা-ধরলা নদীর ভাঙনের কারণে ওই এলাকায় অভাবী মানুষের সংখ্যাই বেশি। তবে মধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যা কম নয়। বন্ধুবর মরহুম আবদুল্লাহিল মাসুদের (জাতীয় ছাত্র সমাজের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং রাজিবপুর উপজেলার এক ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যান) আমন্ত্রণে তার এলাকায় যাওয়ার সুযোগ ঘটে ২০০২ সালে। রাজিবপুরের বালিয়ামারীর বাজারপাড়া গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় চোখে পড়লো বড় অক্ষরে দেয়ালে লেখা ‘কুকুর আর ছাত্রশিবির হতে সাবধান’। দেয়ালে ছিঁকা মারা লেখা দেখিয়ে মাসুদ জানালো এ গ্রামে ইসলামী ছাত্রশিবিরের এক নেতার বাড়ি। তাই পাড়ার ছাত্রসমাজের ছেলেরা এসব লিখে রেখেছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ ছাত্রশিবিরের বড় নেতা। পরবর্তীতে জানা যায়, শিবিরের সেই বড় নেতার নাম ইমরান এইচ সরকার। শিবির থেকে ছাত্রলীগে যোগ দেন অতঃপর আওয়ামী লীগ সমর্থিত স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের নেতৃত্বে আসলে ভাগ্যের চাকা খুলে যায়। আর একজন ব্লগার হওয়ায় শাহবাগে হয়ে উঠেন দেশের স্বাধীনতা স্বপক্ষের শক্তির হর্তাকর্তা। মিডিয়া ছোটে তার পিছনে। ইমরানকে মহান নেতা করতে যেন কিছু টিভির সাংবাদিক কোমর বেঁধে মাঠে নামেন।ইমরান এইচ সরকারের দাদার নাম হাজি খয়ের উদ্দিন সরকার। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুসলিম লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা এবং নানা অপকর্মের কারণে মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় তাকে হত্যা করা হয়। ইমরান ছাত্রশিবিরের সদস্য হিসেবে রংপুর মেডিকেলে পড়ার সুযোগ-হোস্টেলে সিট পান। ওই সময় রংপুরে জাসদ ছাত্রলীগ-শিবির সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনা ছিল নিত্যখবর। ধুরন্ধর হিসেবে পরিচিতি ইমরান এইচ সরকার এক সময় ছাত্রশিবির ছেড়ে দিয়ে আওয়ামী সমর্থিত ছাত্রলীগে যোগ দেন এবং কলেজ শাখার সভাপতি হন। এমবিবিএস পাসের পর রংপুর থেকে ঢাকায় এসে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চিকিৎসক সংগঠনের প্রচার উপ-কমিটির সদস্য হন।অনুসন্ধান করে জানা গেছে ইমরান এইচ সরকারের পিতার নাম মতিউর রহমান সরকার মতিন। কুড়িগ্রাম জেলার রাজীবপুর উপজেলার বালিয়ামারীর বাজারপাড়া গ্রামের মতিন সরকারের চার ছেলে-মেয়ের মধ্যে সবার ছোট ইমরান। ১৯৮৩ সালের ১৪ অক্টোবর জন্মগ্রহণকারী ইমরানের দাদা শান্তি কমিটির সদস্য খায়ের উদ্দিনকে ১৯৭১ সালের ১৪ জুন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা মাখনের চরে হাঁটুপানিতে নামিয়ে গুলি করে মেরে ফেলে। এক সময় উত্তরাঞ্চলে সিপিবির অঙ্গ সংগঠন ক্ষেতমজুর সমিতির ব্যাপাক প্রভাব ছিল। সে সুবাদে ইমরানের বাবা মতিন সরকার স্বাধীনতার পরে বাম-রাজনীতিতে যোগ দেন। বাম রাজনীতি করলেও ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হন। বর্তমানে তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য। ইমরান এইচ সরকার ১৯৯৯ সালে এসএসসি ও ২০০১ সালে এইচএসসি পাস করেন। ২০০২ সালে রংপুর মেডিকেল কলেজে ৩১তম ব্যাচে ছাত্র সে। মেডিকেলেরে ছাত্রাবাসে তিনি প্রথমে ছাত্রশিবিরের সভাপতির সাথে একই কক্ষে থাকতেন। ওই সময় শিবিরকর্মী হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পরে ইমরান ছাত্রলীগে যোগ দিয়ে কলেজ শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক, আহ্বায়ক ও ইন্টার্ন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এমবিবিএস পাস করার পর ২০০৯ সালে ঢাকায় চলে আসেন। এরপর আওয়ামীপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ‘স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ’ (স্বাচিপ) প্রচার উপ-কমিটিতে সক্রিয় হন। তিনি অ্যাডহক ভিত্তিতে কুড়িগ্রামের উলিপুরে চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ পান। পরে স্বাচিপের নেতা হওয়ায় উলিপুরে চাকরি না করে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানসথেশিয়া বিভাগে যোগ দেন। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে সরকারপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর সাবেক ও বর্তমান নেতারা রাজধানীর শাহবাগে ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্ক (বোয়ান) নামে সমবেত হয়। তারা মোল্লার ফাঁসি দাবি করে রাস্তায় বসে পড়েন। ওই সমাবেশকে সরকার পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ায় টানা কর্মসূচির চলতে থাকে এবং মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণা পায়। মিডিয়ায় সরাসরি সম্প্রচার করে ইমরান এইচ সরকারকে জাতীয় নেতায় রূপান্তর ঘটান। পুলিশ প্রহরায় মাসব্যাপী চলে সে অবস্থান কর্মসূচি। এ সময় বিভিন্ন ব্যাংক-কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান অর্থ ও খাবারের যোগান দেয়। প্রচার করা হয় দেশের গোটা তরুণ-যুবক ইমরানের নেতৃত্বে জেগে উঠেছে। প্রচার করা হয় শাহবাগে হচ্ছে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ। আওয়ামী লীগ ও বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো জনবল সরবরাহ করে। স্কুলের অবুঝ বাচ্চা শিশুদের নিয়ে গিয়ে ‘ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই’ শ্লোগান দেয়ানো হয়। শাহবাগের সমাবেশকে গণজাগরণ মঞ্চ আখ্যা দিয়ে ইমরান এইচ সরকারকে মুখপাত্র হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়। ইমরান রাতারাতি হয়ে উঠেন জাতির হর্তাকর্তা। কয়েকটি মিডিয়ার প্রচারণায় ইমরান এইচ সরকার হয়ে উঠেন এদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শীর্ষ নেতা। বছরের পর বছর যুগের পর যুগ মানুষের সেবা করে অনেক নীতিবান রাজনীতিক যে সম্মান পাননি; এক ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে বসে মিডিয়ার বদৌলতে সে খেতাব পেয়ে যান ইমরান! ওই সময় চাঁদাবাজি নিয়ে বিরোধ শুরু হয় শাহবাগীদের মধ্যে। কে কোন ব্যাংক থেকে, শিল্পপতিদের কাছ থেকে শাহবাগের নাম করে কত টাকা আদায় করেছেন তা ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়। পরবর্তীতে চাঁদার টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিরোধ বাধলে ইমরানের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি এবং অর্থআত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়। চাঁদার ভাগবাটোয়ারা নিয়েই শাহবাগীরা নিজেরাই একের পর এক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। সে খবর মিডিয়ায় আসে। খ–বিখ- হয়ে পড়ে গণজাগরণ মঞ্চের চেতনাধারীরা। ব্লগারদের অংশের নেতৃত্বে ইমরান এবং অপর আওয়ামীপন্থী অংশের নেতৃত্বে আসেন আওয়ামী লীগের প্রচার উপ-কমিটির আরেক সদস্য কামাল পাশা চৌধুরী। এই বিভক্তিকে কেন্দ্র করে শাহবাগে ইমরান ও কামাল গ্রুপের মধ্যে রক্তারক্তির ঘটনা ঘটে। তখন কামাল গ্রুপকে জামায়াত-শিবির বলে আখ্যা দেয় ইমরান। আবার ইমরান গ্রুপকে শিবির হিসেবে আখ্যা দেন কামাল গ্রুপ। বিরোধ হলেও ইমরান এইচ সরকার এখনো আলোচিত চরিত্র। কয়েকজন ব্লগার ও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতাদের নিয়ে মঞ্চ বাঁচিয়ে রেখেছেন ইমরান। প্রায় ১০/১৫ জন নিয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে মিছিল করেন। বন্ধু আবদুল্লাহিল মাসুদ ইন্তেকাল করেছেন কয়েক বছর হলো। কুড়িগ্রামের রাজিবপুরে একযুগ আগে তার ‘কুকুর ও ছাত্রশিবির হতে সাবধান’ দেয়ালের লেখার পরিচয় করে দেয়ার দৃশ্য মনে হলে চোখের সামনে ভেসে উঠে এই সেই ইমরান!

 

সূত্রঃ ভোরের বার্তা ডটকম

আল-আমিন খান

জুলাই 30th, 2015

No Comments

Comments are closed.